২৮ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক › আন্তর্জাতিক:

চিত্র:১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নিয়ম ফ্রান্সের হাইস্কুলে| |ক্রেডিট : ইন্টারনেট
২৮ আগস্ট ২০২৬: ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার যখন ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত হচ্ছে, তখনই শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারে কঠোর সীমা আরোপ করতে যাচ্ছে দেশটি। আগামী ১ সেপ্টেম্বর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সের হাইস্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারের জাতীয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের যুক্তি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে এবং শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোনের কারণে সৃষ্ট বিঘ্ন কমাতেই এই পদক্ষেপ। একই সঙ্গে বিরতির সময় শিক্ষার্থীদের পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েক মাসের রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া কাজ করেছে। চলতি বছরের শুরুতে শিশু ও কিশোরদের প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়টি ফরাসি পার্লামেন্টে আলোচনায় আসে। পরে বিষয়টি বিস্তৃত আইনি উদ্যোগের অংশ হিসেবে হাইস্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার দিকে এগোয়। ২১ জুলাই ফ্রান্সের পার্লামেন্টে অনুমোদিত নতুন আইনে ১৫ বছরের কম বয়সিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি হাইস্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনটি পাস হওয়ার পর সরকার জানায়, নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকেই হাইস্কুলে এই বিধান কার্যকর করা হবে। ২৪ আগস্ট সরকারের মুখপাত্র মওদ ব্রেজোঁও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ১ সেপ্টেম্বর থেকে হাইস্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের নতুন নিয়ম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও এর বাস্তব রূপ সব বিদ্যালয়ে এক রকম হবে না। নতুন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি হাইস্কুল তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিধিমালায় ফোন ব্যবহারের বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারণ করতে পারবে। শিক্ষার্থীরা ফোন কোথায় রাখবে, কখন তা ব্যবহার করতে পারবে এবং নিয়ম অমান্য করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করবে। কোনো স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যাগে বন্ধ অবস্থায় রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্য কোথাও বিশেষ বাক্স, নির্দিষ্ট পকেট বা লকারে মোবাইল জমা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশেষ করে বড় ও শিক্ষার্থীসংখ্যা বেশি এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। একসঙ্গে অনেক ফোন সংগ্রহ, সেগুলো নিরাপদে রাখা এবং ছুটির পর শিক্ষার্থীদের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে। নতুন নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রে সময়ের স্বল্পতাও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৭ আগস্ট ল্য মন্ড জানায়, অনেক হাইস্কুল ১ সেপ্টেম্বরের আগেই নতুন বিধান পুরোপুরি বাস্তবায়নের মতো প্রস্তুতি নিতে পারেনি। কারণ স্কুলের অভ্যন্তরীণ নিয়ম পরিবর্তনের জন্য পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অথচ গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময়ে আইনটি চূড়ান্ত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সময় কম ছিল। তবে সব প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে নেই। প্যারিসের বুফোঁ হাইস্কুল এবং বেজিয়েরের জ্যাঁ মুলাঁ হাইস্কুলসহ কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে নতুন নিয়ম তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়েছে। কোথাও আবার বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট এলাকায় ফোন ব্যবহারের সীমিত সুযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, জাতীয় বিধান একই হলেও স্থানীয় বাস্তবতার কারণে প্রয়োগের ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে। চিকিৎসা বা নির্দিষ্ট শিক্ষাগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়মে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ জরুরি বা বিশেষ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। নিয়ম না মানলে ফোন সাময়িকভাবে জব্দ করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে কোনো শিক্ষার্থী কী ধরনের শাস্তি পাবে, তা সংশ্লিষ্ট স্কুলের অভ্যন্তরীণ বিধিমালায় নির্ধারিত হবে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং বিদ্যালয়ের সময় ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের ওপর একটি সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো—ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থা একই সঙ্গে দ্রুত ডিজিটাল হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীরা স্কুলের সময়সূচি, বাড়ির কাজ, নোটিশ ও অন্যান্য শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য জানতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে। অনেক বিদ্যালয়ের খাবার ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন পরিষেবাতেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত মোবাইল নিষিদ্ধ করলেও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবা বন্ধ করার সুযোগ নেই। কোন প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং ব্যক্তিগত মোবাইলের বিকল্প হিসেবে কী ব্যবস্থা থাকবে, সেটিও নতুন নিয়মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ মনে করছে, মোবাইল ফোনের উপস্থিতি ও ব্যবহার সীমিত হলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকেন্দ্রিক মনোযোগ বাড়বে। বিশেষ করে পাঠদানের সময় ফোনের কারণে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। একই সঙ্গে বিরতির সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভিডিও দেখার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে বেশি সময় দিতে পারবে। খেলাধুলা, কথোপকথন ও অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ার ফলে বিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে। সরকারের দৃষ্টিতে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং শিক্ষা ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য। ফ্রান্সের নতুন শিক্ষাবর্ষ তাই শুধু পাঠ্যক্রম বা শ্রেণিকক্ষের নিয়মের পরিবর্তন নয়, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের ওপর এর প্রভাব কী পড়ে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। সূত্র: ফরাসি সরকার, ল্য মন্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।
মন্তব্য:০