৮ জুলাই, ২০২৬
স্বদেশ › স্বদেশ

চিত্র:কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে টানা ভারী বর্ষণ| |ক্রেডিট : ইন্টারনেট
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। গত তিন দিনে সংঘটিত বিভিন্ন দুর্যোগে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। একই সময়ে প্রায় ১৬ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রকাশিত ইন্টার সেক্টর ফ্ল্যাশ সিচুয়েশন আপডেট-২ অনুযায়ী, ৪ জুলাই রাত ৮টা থেকে ৭ জুলাই সকাল ১০টা পর্যন্ত ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোট ১৬০টি দুর্যোগজনিত ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৮৩টি ঝড় ও দমকা হাওয়ার ঘটনা, ৫২টি পাহাড়ধস, ১৪টি আকস্মিক বন্যা, তিনটি পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা এবং দুটি অবকাঠামোগত ঝুঁকির ঘটনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় ১৫ হাজার ৮১৩ জন শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আটজন পাহাড়ধসে এবং দুজন পানিতে ডুবে মারা গেছেন। এছাড়া ১০ জন আহত হয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ৩ হাজার ১৮২ জনকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগে ১ হাজার ৬১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১০টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় মাটি সম্পূর্ণ স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়ায় নতুন করে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্যাম্প-১০, যেখানে ১ হাজার ৮৯১ জন ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এরপর রয়েছে ক্যাম্প-৬, ক্যাম্প-১২, ক্যাম্প-৫, ক্যাম্প-১ ওয়েস্ট, ক্যাম্প-১১, ক্যাম্প-৭, ক্যাম্প-১৬, ক্যাম্প-১৮ এবং ক্যাম্প-১৪। আশ্রয়কেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেও ক্যাম্প-১১ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে ২১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্যোগে ৩৯১টি বিভিন্ন স্থাপনা, ১০৮টি ল্যাট্রিন, ২৪টি পানির উৎস, ২০টি শিক্ষা কেন্দ্র, দুটি মসজিদ, ৪৬৫টি রিটেইনিং ওয়াল, ১০৪টি চলাচলের পথ, ৭৪টি সিঁড়ি, আটটি সড়ক এবং সাতটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ, নিরাপদ আশ্রয় এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। ৬০৯টি ল্যাট্রিন, ১৮৮টি গোসলখানা, ৪২টি নলকূপ, ১১টি ট্যাপ স্ট্যান্ড, নয়টি ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, দুটি পানি সংরক্ষণ বাঁধ এবং ১১টি বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষা খাতেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ৬৭৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৬৬০টি লার্নিং সেন্টার ও ১৮টি কমিউনিটি বেইজড লার্নিং ফ্যাসিলিটি রয়েছে। এছাড়া ৪৫টি লার্নিং সেন্টার বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুর্যোগের পর ৪৬৭টি পরিবারের ২ হাজার ৩৭৬ জনকে জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও পাহাড়ধস, কাদামাটি ও দুর্গম সড়কের কারণে ত্রাণ বিতরণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে ১৭টি মোবাইল মেডিকেল টিম, ১৩টি মেডিকেল হাব এবং ৩৩টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে অনীহা দেখাচ্ছে। চুরির আশঙ্কা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, নারী, গর্ভবতী, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, অর্থসংকট পরিস্থিতি মোকাবিলার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪০ শতাংশ পাওয়া গেছে। ৩ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলারের চাহিদার বিপরীতে এখনো ২ কোটি ৩২ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে আশ্রয় ও ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা খাতেও প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪২ শতাংশ নিশ্চিত হয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত অর্থায়ন না হলে জরুরি মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সূত্র: ইন্টার সেক্টর ফ্ল্যাশ সিচুয়েশন আপডেট-২
মন্তব্য:০