১৭ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক › আন্তর্জাতিক:

চিত্র:রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র| |ক্রেডিট : ইন্টারনেট
দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংকট এবং এর প্রভাবে বাড়তে থাকা লোডশেডিংয়ের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা আরও ঘনিয়ে এসেছে। সব প্রস্তুতি ও পরীক্ষা নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষ করা সম্ভব হলে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ সফলভাবে সম্পন্ন হলে কয়েক মাসের মধ্যেই প্রথম ইউনিট পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস হিসেবে রূপপুরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর সময় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি ইতোমধ্যে প্রবেশ করানো হয়েছে। উৎপাদনের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দুই ধাপে শতাধিক পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আরও কিছু পরীক্ষা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় চলছে। প্রতিটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ফলাফল পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিচ্ছে। রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালু হলে সেটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। একবার জ্বালানি লোড করার পর প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এরপর জ্বালানি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে একটি ইউনিটকে সর্বোচ্চ প্রায় দুই মাস উৎপাদনের বাইরে রাখতে হতে পারে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে গ্রিডের সক্ষমতাকে। প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অত্যন্ত নির্ভুল ও স্থিতিশীল গ্রিড ব্যবস্থার মাধ্যমে সঞ্চালন করতে হয়। সে কারণে রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রহণ ও বিতরণের জন্য জাতীয় গ্রিডকে পর্যাপ্ত শক্তিশালী করা জরুরি। তিনি বলেন, গ্রিডে সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দিলেও যাতে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি না হয় এবং রূপপুরের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে, সে বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার পিডিবি, পিজিসিবিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। রূপপুরের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য বাঘাবাড়ীর ২৩০ কেভি, বগুড়ার ৪০০ কেভি এবং গোপালগঞ্জের আরও একটি ৪০০ কেভি অবকাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব অবকাঠামোর বেশিরভাগের কমিশনিং ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কেন্দ্রটির পুরো উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আরও কিছু প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, রূপপুরের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দ্রুতগতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের বর্তমান সিস্টেম এখনো পুরোপুরি সমন্বয় করার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যথাযথ সমন্বয় ছাড়া এই বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, পিডিবির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ দেশগুলোর বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। বিদেশি পরামর্শকদের সম্পৃক্ত করে প্রয়োজনীয় আপগ্রেডেশন এবং গ্রিড প্রস্তুতের কাজও চলছে। রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর দাম নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর পিডিবির সঙ্গে পৃথক বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি করার কথা রয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণের হিসাবও পরিবর্তিত হয়েছে। রূপপুর প্রকল্পের আর্থিক দিক নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, প্রকল্পটির বেশ কিছু পেমেন্ট এখনো বকেয়া বা আটকে রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা থাকায় নির্ধারিত আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নির্ধারিত আর্থিক চ্যানেল ব্যবহার করতে না পারায় রূপপুর প্রকল্পের বিভিন্ন অর্থ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। এর ফলে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ কতটা স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তাই একদিকে দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বড় সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা, কারিগরি নিরাপত্তা, বিদ্যুতের মূল্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হলে তা হবে কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
মন্তব্য:০