১৯ আগস্ট, ২০২৬
স্বদেশ › স্বদেশ

চিত্র:প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান| |ক্রেডিট : ছবি: সংগৃহীত
কর আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি করদাতাদের আস্থা অর্জন এবং রাজস্ব প্রশাসনকে জনবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করা টেকসই পদ্ধতি নয়। বরং কর প্রদানে সক্ষম সবাইকে শনাক্ত করে নিয়মের আওতায় আনতে হবে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত এই সম্মেলনে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। তারেক রহমান বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমের সাফল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এনবিআরকে কার্যকর, দক্ষ ও জনগণের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ বর্তমানে এনবিআরকে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। বিশেষ করে করদাতাদের প্রত্যাশা, এনবিআর তাদের আস্থার জায়গায় পরিণত হবে। দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই আস্থা অর্জন করা সম্ভব। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। নীতি ও নিয়মের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে পৃষ্ঠপোষকতা, কারও প্রতি বিরূপ আচরণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এনবিআর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তবে এখন ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরনও বদলে যাচ্ছে। ব্যবসায় নতুন নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। এই বাস্তবতায় ডিজিটাল ইকোনমি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, ট্রেড ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম, মানি লন্ডারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে রাজস্ব কর্মকর্তাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও এখনো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। ফলে শুধু নিয়মিত করদাতাদের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব বাড়ানো যাবে না। করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা আরও জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের উদ্দেশ্য শুধু বেশি কর আদায় করা নয়; বরং মানুষকে স্বেচ্ছায় কর দিতে উৎসাহিত করা। যারা কম কর দেন, তাদেরও সম্মান দিতে হবে। আর যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেন, তাদের কর প্রদানে উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কর ব্যবস্থাকে সহজ করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর ব্যবস্থাপনা ও আদায় প্রক্রিয়া দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। মানুষ যেন স্বেচ্ছায় এবং স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কর দিতে পারেন, এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক ও ডিজিটাল ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। ভ্যাট ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভ্যাট আধুনিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। তবে এর সফলতা নির্ভর করে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে শুধু কঠোরতার ওপর নির্ভর না করে আস্থার সম্পর্ক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার প্রতি করদাতাদের বিশ্বাস তৈরি করা গেলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়ে যাবে। এনবিআরকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যাকে মানুষ ভয় নয়, বিশ্বাস করবে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থে এনবিআরকে আরও বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। ব্যক্তি স্বার্থের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান এবং দেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখতে হবে। তিনি বলেন, সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। দেশের প্রতিটি মানুষের অবদানকে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। সমস্যা থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাধানের পথ বের করা সম্ভব। সরকারি কর্মকর্তাদের দেশ গঠনে নিরাপদ ও স্বস্তির সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ইতিবাচক ছিল। এতে প্রমাণিত হয়েছে যে কর্মকর্তারা চাইলে আরও ভালো করতে পারেন। দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর রাজস্ব আদায়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বক্তব্য দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্টলে স্থাপিত ডিজিটাল স্ক্রিনে বিভিন্ন উপস্থাপনা ঘুরে দেখেন। সূত্র: রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
মন্তব্য:০