শিরোনাম
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর, রামপালে ৪৬০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্পের উদ্যোগ *** বন্ধ পত্রিকা চালুর তাগিদ, সাংবাদিকদের ঐক্যের আহ্বান রাষ্ট্রপতির *** এসআরবি বিল সংসদে তোলার সুপারিশ, র‌্যাবের জনবল-অবকাঠামো কাজে লাগানোর তাগিদ *** গণতন্ত্র রক্ষায় গণমাধ্যমকে বাঁচাতে হবে: রাষ্ট্রপতি *** ডেঙ্গুতে এক দিনে ৯ মৃত্যু, হাসপাতালে আরও ১,৫৭১ ***




↠সিডনি-বাংলা ডেস্ক রিপোর্ট :


৮ আগস্ট, ২০২৬

আন্তর্জাতিক › আন্তর্জাতিক:

মন্তব্য:০

News Picture

চিত্র:সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের পতাকা| |ক্রেডিট : ইন্টারনেট

ইরান সংকটের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রতিরক্ষা বলয়, সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের কৌশলগত জোট

মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ‘মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স এগ্রিমেন্ট’ নামে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতাকে বিশ্লেষকরা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। চুক্তির মূল বিষয় হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। চুক্তির আগে শেহবাজ শরিফ সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরব সফর করেন এবং ওমরাহ পালন করেন। একই সময়ে সৌদি আরবে সফর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠকের পর তিন দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পৌঁছান। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে আলোচনার গতি বাড়ে। যদিও তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কারণে সৌদি আরব সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এবং জর্ডানও সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ইরান, হুথি গোষ্ঠী, হিজবুল্লাহ এবং ইরান-সমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীকে ঘিরে চলমান সংঘাত গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আল জাজিরার আঙ্কারা প্রতিনিধি রেসুল সেরদারের মতে, ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকট, ইরানের ওপর হামলা এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিই তিন দেশকে একটি বাধ্যতামূলক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। চলতি বছরের মার্চে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বৈঠকের ফাঁকে রিয়াদে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সম্ভাব্য নিরাপত্তা সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এরও আগে ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে পৃথক প্রতিরক্ষা সমঝোতা হয়েছিল। নতুন চুক্তিকে সেই উদ্যোগের আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই জোটে তিন দেশের শক্তি একে অপরকে পরিপূরক করবে। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী এবং দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প, সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি শক্তি ও আর্থিক সক্ষমতার অধিকারী, আর পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এবং দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশ। ফলে সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তুরস্কবিষয়ক বিশ্লেষক ওজগুর উনলুহিসারচিকলি বলেন, এটিকে ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে প্রতিরক্ষা-শিল্প, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তা সমন্বয় জোরদারের একটি কাঠামো। একই সঙ্গে এটি বিদ্যমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনেরও প্রতিফলন। হাসান কালিওনচু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুরাত আসলান মনে করেন, এই চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। তার মতে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে তিন দেশের নিরাপত্তা-উদ্বেগও এই সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি। আল জাজিরার দোহা প্রতিনিধি ওসামা বিন জাভাইদের মতে, বিশ্বের বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার তিনটি প্রভাবশালী দেশকে একই নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার মাধ্যমে এই সমঝোতা আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সমন্বয় আরও জোরদার হবে। চুক্তি নিয়ে এখন পর্যন্ত ইরানের সরকারিভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দেশটির সংসদ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগুজে চুক্তি সৌদি আরবকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না এবং অন্যের ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে নিজেদের নীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে রয়টার্সকে এক তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। ভবিষ্যতে অন্যান্য আঞ্চলিক দেশও চাইলে এতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে। এর মধ্যেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আবারও অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা ভেস্তে দিতে ইসরায়েল চেষ্টা করছে এবং গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানেরও সমালোচনা করেছেন। পাকিস্তানও ধারাবাহিকভাবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে আসছে। একই সঙ্গে দেশটি ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য বৃহত্তর যুদ্ধ এড়াতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থাকার চেষ্টা করছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক সংকট নিরসন সংস্থা **ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ**–এর গালফ ও অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক ইয়াসমিন ফারুকের মতে, তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং মিসরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রচেষ্টা এই উপলব্ধিরই প্রতিফলন যে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা আর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে রাখা সম্ভব নয়। তবে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু বিশ্লেষক এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই নিরাপত্তা উদ্যোগকে সম্ভাব্য একটি ‘সুন্নি কৌশলগত বলয়’ হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন। মক্কার এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণের সূচনা হলো বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের পাশাপাশি আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা-নির্ভরতা পুনর্বিন্যাসের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ। সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স।





মন্তব্য