শিরোনাম
মাউন্ট মিঝিরগিতে বরফধস, নিহত ১১ পর্বতারোহী *** উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে ওয়াশিংটনের নীতিবদল, নিজস্ব প্রতিরক্ষায় সিউল *** ইস্টার্ন ইকনোমিক ফোরামে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নে চীনের নতুন প্রস্তাব *** জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় চীন-নেপালের যৌথ উদ্যোগের আহ্বান *** ‘যতক্ষণ আশার ক্ষীণ আলো থাকবে, চীন কখনও হাল ছাড়বে না’: সিচাংয়ে উদ্ধারকাজ ***




↠সিডনি-বাংলা ডেস্ক রিপোর্ট :


৩১ আগস্ট, ২০২৬

স্বদেশ › স্বদেশ

মন্তব্য:০

News Picture

চিত্র:রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।| |ক্রেডিট : ইন্টারনেট

গুমের অপরাধে ক্ষমতাবানরাও ছাড় পাবে না, ‘আয়নাঘর’ আর নয়: রাষ্ট্রপতি

গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি যত বড় ক্ষমতাবানই হোক, তাকে বিচারের আওতায় এনে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, জোরপূর্বক গুমের ঘটনা শুধু নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির জীবনকেই বিপর্যস্ত করে না; এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। বছরের পর বছর প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তিনি বিশেষভাবে সেইসব পরিবারের সদস্যদের কথা স্মরণ করেন, যারা প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পেয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। এমন সন্তানদের কথাও তুলে ধরেন তিনি, যাদের শৈশব কেটেছে বাবার ফিরে আসার প্রতীক্ষায়, কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেনি। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, গুমকে নিছক একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। একটি মানুষকে তার পরিবার ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি তার স্বজনদের হাসি, শান্তি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক স্বস্তিও কেড়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গুম ও হত্যার মাধ্যমে এসব সাংবিধানিক অধিকার একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিগত দেড় দশকে দেশে গুম এবং গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ভিন্নমত প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে অনেক মানুষকে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করা হয়েছে। অনেকে গোপনে হত্যার শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। অথচ তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এসব গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনের নাম উল্লেখ করেন তিনি। এসব নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাদের স্বজনদের অনেকের জীবন এখনো বেদনা, অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তায় আবদ্ধ। এ ছাড়া আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিকদের গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখার অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনেককে দীর্ঘ সময় অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ও আলো-বাতাসহীন ‘আয়নাঘরে’ বন্দি রাখা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল বলেও দাবি করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, গুমের শিকার কয়েকজন পরবর্তীতে ফিরে এলেও বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে গুমের ঘটনাকে তুলনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন উৎসর্গকারী মানুষদের আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, বাক্স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীন দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার বিপরীত এক ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। জাতীয় ইতিহাসে এটি গভীরভাবে বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি। রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এসব ঘটনার একদিন বাংলাদেশের মাটিতেই বিচার হবে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এদের অনেকেই গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত। প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার বিষয় উঠে এসেছে বলেও জানান তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এসব বর্বরতা চালানো হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনকে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Victims first, Action now’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া এখন জরুরি। গুমকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপনের কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের ঘটনায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের একমাত্র দায়িত্ব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক অনিশ্চয়তার বিষয়টিও রাষ্ট্রকে বিবেচনায় নিতে হবে। এসব পরিবারের মর্যাদা রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের রয়েছে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা থাকবে না। মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে, তবে ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ দেওয়া হবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের অধীন থাকবে। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। নাগরিক কতটা নিরাপদ, রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, সমাজে কতটা ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত এবং মানুষ কতটা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছে—এসব বিষয়ই একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি। রাষ্ট্রপতি বলেন, “এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না।” কোনো মা যেন সন্তানের জন্য এবং কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর জন্য অনন্ত অপেক্ষায় চোখের পানি না ফেলেন—এমন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি। গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে হবে। দেশে ফ্যাসিবাদের পুনরাবির্ভাবের সব পথ চিরতরে বন্ধ করার ঘোষণাও দেন তিনি। গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোকে রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি সরকারের প্রতি এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। সবশেষে তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও নাগরিক মর্যাদাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সুশাসন, জবাবদিহি, বাক্স্বাধীনতা ও ইনসাফকে রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য ভিত্তি করার ওপর গুরুত্ব দেন। গুম ও বিচারহীনতার অন্ধকার অতিক্রম করে বাংলাদেশ সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। সূত্র: রাষ্ট্রপতির বক্তব্য; আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের অনুষ্ঠান





মন্তব্য